কুড়িগ্রামে সুপারির বাজার অর্ধেকে, কাঁচা সুপারি কিনছে চীনা কোম্পানি
ছবি সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কয়েক বছরের ব্যবধানে কুড়িগ্রামে সুপারির বার্ষিক বেচাকেনা ১০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এর মধ্যে অপরিপক্ব কাঁচা ও নরম সুপারি প্রতি পিস তিন টাকা দরে কিনছে চীনা কোম্পানিগুলো। উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিপক্ব হওয়ার আগেই সুপারি বাজার থেকে চলে যাওয়ায় আসন্ন মৌসুমে সরবরাহ সংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
জেলায় সুপারিগাছের সংখ্যা থাকলেও কমছে ফলন। কোনো গাছে সামান্য সুপারি ধরেছে, আবার কোনো গাছে একেবারেই ফলন নেই। গত বছর যেসব গাছে দু-একটি থোকা সুপারি ছিল, এবার সেগুলোর অনেক গাছেই ফল দেখা যাচ্ছে না। আবার যেসব গাছে আগে তিন থেকে পাঁচটি থোকা ধরত, এবার সেখানে মিলছে মাত্র এক-দুটি। এতে বিপাকে পড়েছেন চাষি ও বাগান ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, কয়েক বছর আগেও জেলায় বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে সুপারির বাজার অর্ধেকেরও বেশি সংকুচিত হয়েছে।
উৎপাদন কমার পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে কাঁচা ও নরম সুপারি সংগ্রহের প্রবণতা। চীনা কোম্পানিগুলো সরাসরি এবং স্থানীয় ডিলার ও সাব-ডিলারদের মাধ্যমে এসব সুপারি কিনছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং এলাকায় মাইকিং করেও চলছে সংগ্রহ কার্যক্রম। স্থানীয় সাব-ডিলাররা সুপারি সংগ্রহ করে ডিলার পয়েন্টে পাঠাচ্ছেন। তিস্তা ও রংপুরের বিভিন্ন ডিলার পয়েন্ট থেকেও এসব সুপারি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত চার বছর ধরে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এভাবে কাঁচা সুপারি কেনাবেচা হচ্ছে। এবার কুড়িগ্রামের রাজারহাটসহ বিভিন্ন উপজেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে এ কার্যক্রম।
রাজারহাটের নাজিমখান বাজারের আশা অফিসসংলগ্ন এলাকা ও নাজিমখান ব্রিজ রোডে গড়ে উঠেছে সুপারি সংগ্রহের একাধিক সাব-ডিলার পয়েন্ট। সেখানে প্রতি পিস কাঁচা ও নরম সুপারি কেনা হচ্ছে তিন টাকা দরে। সে হিসাবে প্রতি হালি ১২ টাকা এবং প্রতি পন ২৪০ টাকা।
স্থানীয় সাব-ডিলার হাবিবুর রহমান জানান, তিনি ইতোমধ্যে ৮ থেকে ৯ হাজার পিস সুপারি কিনেছেন। নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি সুপারি ২২ থেকে ৩২ গ্রাম ও লম্বাটে হতে হবে। পাশাপাশি সুপারি হতে হবে কাঁচা, সবুজ এবং ভেতরের অংশ নরম।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কাঁচা ও নরম সুপারি নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের জনপ্রিয় চিবানোর সুপারি ‘বিংলাং’, বিভিন্ন ধরনের নির্যাস এবং প্রসাধনীসহ অন্যান্য শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী উপাদান।
রাজারহাটের সুপারি বাগান ব্যবসায়ী রায়হানুর রহমান কাজল বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বাগানগুলোতে প্রায় ৩০ শতাংশ ফলন কমেছে। তার নিজের ১০টি সুপারি বাগান রয়েছে। গত মৌসুমে এসব বাগানের সুপারি বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এবার ফলন কম হওয়ায় সুপারির দাম বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
সুপারি ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, আবহাওয়া ও গাছের বয়সের কারণেও সুপারি গাছ মারা যায়। তবে এবার ফলন কম হওয়ায় বাজারে সুপারির সংকট তৈরি হতে পারে। এতে দাম বাড়ার পাশাপাশি সুপারি পচানো ও সংরক্ষণের খরচও বাড়তে পারে।
নাজিমখান বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, মজা সুপারি আকারভেদে প্রতি পন বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অন্যদিকে সঠিবাড়ি, খুলনা ও বৈরাতি জাতের সুপারি বিক্রি হচ্ছে প্রতি পন ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সুপারির বাগান রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুপারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এটি বহু কৃষক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। তবে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিপক্ব হওয়ার আগেই কাঁচা সুপারি সংগ্রহের প্রবণতা এ খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। ফলে আসন্ন মৌসুমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরীন বলেন, তাপমাত্রার ওঠানামা, বৃষ্টিপাতের অভাব, খাদ্য ও পুষ্টির ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় রোগবালাইয়ের কারণে সুপারির ফলন কমেছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় কৃষকদের পরিমিত সেচ দেওয়া, বছরে দুইবার সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী বালাইনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন